Louvre Museum Robbery: অবশেষে ফ্রান্সের প্যারিসের বিশ্বখ্যাত ল্যুভের মিউজিয়ামের ডাকাতি কাণ্ডে সন্দেহভাজন দুই জনকে গ্রেফতার করা হল। দু:সাহসিক ডাকাতির এক সপ্তাহ পর ল্যুভের কাণ্ডে প্রথম গ্রেফতারি হল। রীতিমত ফাঁদ পেতে এই দুই দুষ্কৃতিকে গ্রেফতার করে প্যারিস পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল। গ্রেফতার দুই সন্দেহভাজনের একজন ফরাসি-আলজেরিয়ান মেকানিক ও একজন রোমানিয়ান ওয়েল্ডার। উভয়ের ডিএনএ মেলে হেলমেট ও গ্লাভসে পাওয়া নমুনার সঙ্গে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, তারা বড় একটি অপরাধচক্রের সদস্য, সম্ভবত বালকান অঞ্চলের হীরে চোরচক্রের সঙ্গে যুক্ত। মনে করা হচ্ছে, এই দুইজন ল্যুভের মিউজিয়ামে ঢুকে ডাকাতিতে সরাসরি জড়িত ছিলেন। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ডিএন পরীক্ষা চলছে।
অপরাধীদের ২০ বছরের কারাদণ্ড অপেক্ষা করছে
ল্যুভেরে ডাকাতির সময় ঘটনাস্থলে ফেলে যাওয়া হেলমেট, গ্লাভস, গ্যাস সিলিন্ডার ও কাঁচের টুকরো থেকে উদ্ধার হয় ১৫০টিরও বেশি ডিএনএ নমুনা। গ্রেফতার হওয়া দুজনের সঙ্গে ডিএনএ-র নমুনা মিলে গেলে বড় সাফল্য পাবে প্যারিস পুলিশ বিভাগের ১০০ জন অফিসার ও ইন্টারপোল যুক্ত হওয় বিশেষ তদন্তকারী দল। ল্যুভের মিউজিয়ামের ডাকাতিতে খোয়া যাওয়া দুর্মল্য জিনিসের মোট মূল্য ৮৮ মিলিয়ন ইউরো বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮০৫ কোটি ২০ লক্ষ টাকা। এই গয়নাগুলি বিমাহীন ছিল, কারণ সেগুলি জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে গণ্য। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে 'গুরুতর চুরি','অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র',ও 'সাংস্কৃতিক সম্পদের ধ্বংস'এই তিন ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ডের শাস্তি হতে পারে।
চুরি করা গয়নাগুলি গলিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অনুমান
গত ১৯ অক্টোবর, রবিবার প্যারিসে ল্যুভর মিউজিয়াম খোলার কয়েক মিনিট আগে চারজন মুখোশধারী দুষ্কৃতী ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসাহসিক দিনের আলোয় ডাকাতি করে। তাদের টার্গেট ছিল 'গ্যালারি দ্য আপোলন', যেখানে রাখা ছিল নেপোলিয়নিক যুগের রাজমুকুট ও রাজকীয় গয়না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গয়নাগুলির অনেকগুলিই গলিয়ে কালোবাজারে বিক্রি হতে পারে, যা আসল মূল্যের মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ দেবে। উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা কম।
কীভাবে হয়েছিল ডাকাতি
সেই ডাকাতরা এসেছিল নির্মাণকর্মীর পোশাকে। এক নিঁখুত চালে তারা একটি চুরি করা ট্রাক, যাতে ছিল হাইড্রলিক লিফ্ট, সেটি মিউজিয়ামের সামনে পার্ক করে দেয়। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ডাকাতির কাজ শুরু। ট্রাকের লিফ্ট ব্যবহার করে দুই দুষ্কৃতী ওঠে দক্ষিণ দিকের দ্বিতীয় তলার বারান্দায়, যেখান থেকে সরাসরি 'গ্যালারি দ্য আপোলন'-এ ঢুকে পড়া যায়। এই গ্যালারি সূর্যদেব আপোলনের নামে নামাঙ্কিত, এবং ২০২০ সালে এর পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ব্যাটারি চালিত কর্ডলেস করাত দিয়ে মাত্র দুই মিনিটে কেটে ফেলে শক্ত কাঁচের জানলা। কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে, সাইলেন্ট অ্যালার্ম বেজে ওঠে, কিন্তু নিরাপত্তা দল পৌঁছনোর আগেই তারা ভিতরে ঢুকে যায়। ভিতরে ঢুকে চারজনের দলটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চলাফেরা করে। কয়েকজন দর্শককে দ্রুত বের করে দেওয়া হয়, সাইরেন বাজতে শুরু করে, কিন্তু তারা থামে না। নেপোলিয়ন তৃতীয়ের স্ত্রী এমপ্রেস ইউজেনি, কুইন মেরি-আমেলি, ও কুইন অর্টেন্সের ব্যবহৃত গয়নাগুলি রাখা ছিল সেখানে বুলেটপ্রুফ কাচের আলমারিতে।
সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে বড় ডাকাতি
আটটি অমূল্য গয়না নিয়ে পালায় তারা। এর মধ্যে ছিল ১ কোটি ২০ লক্ষ ইউরো মূল্যের নীলা মণির মুকুট, ১ কোটি ৫০ লক্ষ ইউরো মূল্যের পান্নার হার, ৮০ লক্ষ ইউরো মূল্যের মুক্তো ও হীরের ব্রোচ মোট মূল্য প্রায় ৮৮ মিলিয়ন ইউরো (১০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
জানলার সরু ফাঁক দিয়ে বেরোনোর সময় পড়ে যায় দুটি গয়না, এমপ্রেস ইউজেনির স্বর্ণমুকুট ও আরেকটি মূল্যবান অলংকার, যা পরে উদ্ধার হয়। নিচে নেমে এসে তারা ট্রাকটিতে গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে আগুন ধরানোর চেষ্টা করে, যাতে প্রমাণ মুছে ফেলা যায়। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। চারজন দুইটি মোটরবাইকে ভাগ হয়ে যায়, সেঁই নদীর ধারে পঁ ন্যুফ ব্রিজের দিকে পালিয়ে যায়। সিসিটিভিতে তাদের ধীরস্থির পালানোর দৃশ্য ধরা পড়ে। মাত্র সাত কিংবা আট মিনিটেই ঘটে যাওয়া এই ডাকাতির কথা শুনে চমকে যায় গোটা বিশ্ব। ল্যুভরের ডিরেক্টর লরেন্স দে কার্স ফরাসি সিনেটের সামনে স্বীকার করেন, বারান্দায় কোনও ক্যামেরা ছিল না, পুরোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। পরদিনই তিনি পদত্যাগ করেন।