পার্থ প্রতিম চন্দ্র: রাউন্ড রবীন লিগে টানা তিনটি বড় ম্যাচে হেরে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপে (Women's ODI World Cup 2025) একেবারে বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল (India Women's Cricket Team)। ৯ থেকে ১৯ অক্টোবরের মধ্যে টানা তিনটি ম্যাচে হরমপ্রীতরা হারেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী তিন দল দক্ষিণ আফ্রিকা (৩ উইকেটে), অস্ট্রেলিয়া (৩ উইকেটে) ও ইংল্যান্ড (৪ রানে)-এর বিরুদ্ধে। কিন্তু সেখান থেকে ১০ দিনের মধ্যে তিনটি বড় ম্য়াচে জিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতল ভারতীয় মহিলা দল। রূপকথার চেয়েও যেন অবিশ্বাস্য দেখাল হরমনপ্রীতদের বিশ্বকাপ জয়কে। গত ২৩ অক্টোবর নবি মুম্বইতে হরমনপ্রীতরা নেমেছিলেন নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে লিগের ম্যাচে। সেই ম্যাচে হারলেই পাকাপাকিভাবে বিদায় হত ভারতের। খাদের কিনা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিউদের বিরুদ্ধে হরমনপ্রীতরা জিতেছিলেন ৫৩ রানে (বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ডিএল পদ্ধতিতে)।
রূপকথার জয়
এরপর গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় সেমিফাইনালে প্রথমে ব্যাট করে যখন শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া ৩৩৮ রান করল, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন হরমনপ্রীতদের বিদায় শুধু সময়ের অপেক্ষা। চতুর্থ হয়ে সেমিফাইনালে ওঠা হরমনপ্রীতরা সেই রেকর্ড রান তাড়া করতে নেমে মাত্র ৫৯ রানের মধ্যে দলের দুই ওপেনারের উইকেট হারায়। সেখান থেকে নবি মুম্বইয়ে রূপকথার ইনিংস দলকে জিতিয়ে ছিলেন জেমাইমা রডরিগেজ (১২৭)। এরপর সেই নবি মুম্বইয়ে ফাইনালে অবিশ্বাস্য জয়।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক খাদের কিনার থেকে ভারতীয় মহিলা দলের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পিছনে পাঁচ বড় কারণ বা টার্নিং পয়েন্ট
১) সেমিফাইনালে অজিদের বিরুদ্ধে জেমাইমা রডরগিজের অবিশ্বাস্য ইনিংস:
গত বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে অবিশ্বাস্য জয়ের নায়িকা ছিলেন ১২৭ রানের দুরন্ত ইনিংস খেলা জেমাইমা রডগরিগেজ (Jemimah Rodrigues)। একবারে নিশ্চিত হারা ম্যাচ জিতিয়ে দিয়েছিলেন জেমাইমা। ফাইনালে উঠতে হলে ৩৩৯ রান করতে হবে এমন শর্তে ব্যাট করতে নেমে ৫৯ রানের মধ্যে দলের দুই ওপেনারকে হারিয়েও জিতেছিলেন হরমনপ্রীতরা। এই অসম্ভবটা সম্ভব হয়েছিল তিন নম্বরে নেমে জেমিমা রডরগিডেজের ১২৭ রানের অপরাজিত অবিশ্বাস্য ইনিংসের সৌজন্যে। সেমিফাইনালের এই অবিশ্বাস্য জয়টা ফাইনালে নামার আগে ভারতীয় মহিলা দলের মনোবল অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
২) ফাইনালে শেফালি ভর্মা ও দীপ্তি শর্মার অনবদ্য অলরাউন্ড পারফরম্যান্স
ফাইনালে একেবারে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলেন শেফালি ভর্মা ও দীপ্তি শর্মা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ফাইনালে ভারতকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেওয়ার পিছনে বড় ভূমিকা নেন শেফালি ভর্মা ও দীপ্তি শর্মা। প্রীতীকা রাওয়াল চোট না পেলে যে শেফালির বিশ্বকাপের ফাইনালটা টিভিতে ঘরে বসে দেখার কথা ছিল। ওপেন করতে নেমে শেফালি ভর্মা ৭৮ বলে ৮৭ রান, তারপর হাত ঘুরিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন। অন্যদিকে, অনবদ্য হাফ সেঞ্চুরির পর ৩৯ রানে পাঁচ উইকেট তুলে নিয়ে জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন দীপ্তি শর্মা।
৩) কলম্বোর বৃষ্টি
এবার মহিলাদের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ৩১টি-র মধ্যে ৬টি ম্যাচ বৃষ্টির কারণে ভেস্তে যায়। বৃষ্টির কারণে ব্যাহত ডজনখানেকেরও বেশি ম্যাচ। তবে ভারতীয় মহিলা দলের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পিছনে কলম্বোর বৃষ্টিরও ভূমিকা রয়েছে। আসলে গ্রুপ লিগে মোট ৭ পয়েন্ট পেয়ে সেমিফাইনালে ওঠে ভারত। সেখানে পঞ্চম শ্রীলঙ্কা ৫ পয়েন্ট ও ষষ্ঠ স্থানে থাকা নিউ জিল্যান্ড ৪ পয়েন্ট পেয়ে বিদায় নেয়। শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় মোট ৫টি ম্যাচ বৃষ্টির কারণে পুরোপুরি ভেস্তে যায়। শ্রীলঙ্কার তিনটি ম্যাচ বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়। বৃষ্টিতে ভেস্তে যাওয়া ম্যাচগুলির মধ্যে নিউ জিল্যান্ডের আছে দুটি অপেক্ষাকৃত সহজ ম্যাচ। গত ১৪ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ও ১৯ অক্টোবর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মহিলাদের টি-২০ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন নিউ জিল্যান্ডের ম্যাচ ভেস্তে যায়। খাতায় কলমে অনেকটাই শক্তিশালী কিউইরা এই দুটি ম্যাচ জেতার কথা ছিল। তাই ৪ পয়েন্টের বদলে কিউইরা ওই দুটি ম্যাচ থেকে মাত্র ২টি পয়েন্ট পায়। এখানেই হরমনপ্রীতরা বড় সুবিধা পেয়ে যান। যদিও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নবি মুম্বইয়ে হরমনপ্রীতদের লিগের শেষ ম্যাচ বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়েছিল। তবে তার আগেই ভারত সেমিফাইনালে ওঠা নিশ্চিত করেছিল। নিউ জিল্যান্ডের লিগ পর্বে সহজ দুটি ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেস্তে গেলে, ভারতের লিগ পর্বে টানা তিনটি বড় ম্যাচে হার হরমনপ্রীতদের বিদায় ঘটিয়ে দিতে পারত। অবশ্য যদির কথা শেষ পর্যন্ত নদীতেই যায়।
৪) টানা তিনটি হারের কোচ কোচ অমল মজুমদারের ভোকাল টনিক:
গত ইন্দোরে ইংল্যান্ডের কাছে লড়ে হারের পর মনোবল একেবারে ভেঙে পড়েছিল হরমনপ্রীত কৌরদের। বিশ্বকাপ জয়ের পর সেই ম্যাচের কথা মনে করে স্মৃতি মন্ধনা বললেন, "আমরা সেই সময় খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। আমরা মোটেও খারাপ খেলছিলাম না, কিন্তু টানা তিনটি ম্যাচ হেরে আমাদের কাজটা অনেকটা কঠিন হয়ে যায়। তবে খেলার শেষে আমাদের কোচ অমল মজুমদার সেই সময় ড্রেসিংরুমে আমাদের বলেছিলেন, ভালই খেলছে। আত্মবিশ্বাসটা রাখো। এভাবে খেললে, আর একটু ভুল শুধরে নিলে আমাদের চ্যাম্পিয়ন হতে অসুবিধা হবে না। কোচের কথা যে এইভাবে মিলে যাবে তা ভাবিনি।"অমল মজুমদারের ভোকাল টনিক হরমনপ্রীতদের অধরা মাধুরী এনে দিল।
৫) স্মৃতি মন্ধনার ব্যাটিং
টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা পারফম্য়ান্স। ওপেন করতে নেমে ৯টি ম্যাচে স্মৃতি করেন মোট ৪৩৪ রান, ব্যাটিং গড় ৫৪, স্ট্রাইক রেট প্রায় ১০০। একটি সেঞ্চুরি, দুটি ৮০-র ঘরে রান। স্মৃতির ব্যাটিংটা ভারতকে বিশ্বকাপ এনে দিতে বড় সাহায্য করল। লিগের ম্যাচে নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১০৯ রানের ইনিংসটা ভারতকে সেমিফাইনালে তোলে। ফাইনালে ৪৫ রানের ইনিংসটাও দারুণ। লিগের ম্যাচে দুই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে স্মৃতি করেন যথাক্রমে ৮০ ও ৮৮ রান।