Swami Vivekananda Jayanti 2024: আর কিছু দিন পরেই জাতীয় যুব দিবস, তাঁর আগে রইল স্বামী বিবেকানন্দের জীবন থেকে তুলে আনা পাঁচটি মজার ঘটনা
Swami Vivekananda (Photo Credit Wikimedia commons)

মানুষের নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখা, যে কোনও সমস্যায় লড়াকু মনোভাব রাখা, জাতীয়বাদের ভাবনায় তিনি শুধু বাঙালি নয়, আপামর বিশ্ববাসীর কাছে অনুপ্রেরণা। তিনি স্বামী বিবেকানন্দ। মহান এই বাঙালির জন্ম হয়েছিল ১২ জানুয়ারি ১৮৬৩ সালে।কলকাতার নরেন্দ্রনাথ দত্তর থেকে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠা যুবকের জীবনের গল্প হয়তো কমবেশি সকলেই জানেন। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বই-পত্র স্মৃতিচারণায় স্বামী বিবেকানন্দের যে গাম্ভীর্য্যপূর্ণ অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়, কাছের মানুষদের সামনে তিনি ছিলেন ঠিক তার উলটো। কাজের সময় কাজ, ধর্মতত্ত্বের সময় ধর্মতত্ত্ব, কিন্তু অবসর সময়ে তাঁর মতো প্রাণখোলা লোক দেখতে পাওয়া ভার। আজ স্বামী বিবেকানন্দের জীবন থেকে পাঁচটি মজার ঘটনা তুলে ধরা হলো।

স্বামী বিবেকানন্দের বাবা তার বৈঠকখানায় অনেকগুলি হুঁকো রাখতেন যেন এক জনের পান করা হুকো মুখে দিয়ে অন্যের জাত না যায়।একদিন বালক বিবেকানন্দ সবগুলো হুকোয় একবার করে টান দিলেন।এ তুমি কি করলে?- ক্ষেপে গিয়ে বাবা জানতে চাইলেন।দেখলাম জাত যায় কিনা- বিবেকানন্দের উত্তর।

বেলুড় মঠের ঘটনা। জোসেফিন ম্যাকলাউড স্বামী বিবেকানন্দের পাশ্চাত্ত্যের অনুরাগিনীদের মধ্যে অন্যতম। স্বামীজী তাঁকে স্নেহ করে ‘জো’ বলে ডাকতেন। মর্যাদাপূর্ণ তাঁর আচার-আচরন। এটিকেট সম্বন্ধে সদা সচেতন। স্বামীজীর একবার ইচ্ছে হল তাকে নিয়ে মজা করার। স্বামী সুবোধানন্দকে তাঁর সরলতা ও অল্পবয়স্কতার জন্য, গুরুভাই হলেও স্বামীজী তাঁকে খোকা বলে ডাকতেন। একদিন ডেকে বললেন, ‘খোকা, তুই এই খাবারটা ‘জো’ কে দিয়ে আয়। সে তোকে নিশ্চয়ই ‘Thank You’ বলবে। তুই তাঁর উত্তরে ‘Don’t care’ বলে চলে আসবি’। এ একেবারেই এটিকেট বিরুদ্ধ ব্যবহার। সরল সুবোধানন্দ এসব কিছু সন্দেহ না করেই স্বামীজীর আদেশ পালন করে জিনিসটা জোসেফিনকে দিয়েছেন; জোসেফিনও যথারীতি ‘Thank you’ বলেছেন। সুবোধানন্দজীও স্বামীজীর শেখানো কথা ‘Don’t care’ বলে সঙ্গে সঙ্গে পিছনে ফিরেছেন।দেখতে না দেখতে স্বামীজী ঠিক যেমনটি আন্দাজ করেছিলেন, জো ভীষণ উত্তেজিত হয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে স্বামীজীর কাছে এসে রেগে ফেটে পড়েছেন, ‘What right has this lad to humiliate me!’ জোর সেই রাগত মূর্তি দেখে স্বামীজীর কি হাসি!

এক আমেরিকান পরিবারে থাকাকালীন অন্যদের সঙ্গে খেতে বসে স্বামীজীর খাওয়া হয়ে গেলেই যখন তিনি খাবার টেবিল থেকে উঠে পড়তে চাইতেন, তখন তাঁর নারী হোস্ট বলে উঠতেন, ‘আজ কিন্তু খাবার শেষে আইসক্রিম আছে।‘ স্বামীজী বাচ্চা ছেলের মতো মুখ করে আবার বসে পড়তেন আইসক্রিম খাবার লোভে আর মজা করে বলতেন, ‘নারীদের স্বভাবই হলো পুরুষদের প্রলুব্ধ করা।'

প্রখ্যাত নাট্য নির্দেশক গিরীশচন্দ্র ঘোষের সাথে স্বামীজীর কথা চলছে। স্বামীজীর মতোই গিরিশবাবু শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের ভক্ত। স্বামীজী একসময় বললেন, ‘দেখ জি সি,’ – স্বামীজী গিরীশবাবুকে ‘জি সি’ বলে ডাকতেন – ‘তুমি যাই বল, সাড়ে তিন হাতের মধ্যে সেই বিরাট পূর্ণব্রহ্ম কখনো আসতে পারেন না’। গিরিশচন্দ্র বললেন, ‘হ্যাঁ হয়, কেন হবে না?’ তর্ক শুরু হলো, কেউই নিজের মত ছাড়তে রাজি নন। ক্রমে বিতর্ক উচ্চগ্রামে উঠল। দুজনই আসাধারণ ধীসম্পন্ন, পণ্ডিত এবং বাকযুদ্ধে নিপুণ।

স্বামীজী শান্তভাবে কথা বলে যাচ্ছেন, কিন্তু গিরীশচন্দ্র ক্রমেই উত্তেজিত। বহুক্ষণ কেটে গেল। গিরীশচন্দ্র আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছেন না; স্বামীজীও গিরীশচন্দ্রকে ক্রমে ক্রমে উত্তেজিত করে তুলছেন। শেষে গিরীশচন্দ্র চিৎকার করে মাটিতে হাত চাপড়ে বলে উঠলেন : ‘হ্যাঁরে শালা এসেছে, আমি দেখেছি’।

স্বামীজী তৎক্ষণাৎ উঠে গিরিশচন্দ্রকে আলিঙ্গন করলেন। দোতলা থেকে সিঁড়িতে নামার সময় স্বামীজী সঙ্গী বাবুরাম মহারাজকে বলছেন, ‘জি সি-র সাথে দুটো false talk করা গেল। আমার গুরুর এমন একজন শিষ্য আছে, যাকে বিশ্বাসের অতল পাহাড় থেকে কেউ নামাতে পারবে না’।

স্বামী বিবেকানন্দ নাম ধারণ করার আগে তাঁকে ডাকা হতো নরেন নামে। নরেন তখন মেট্রোপলিটন স্কুলে। একদিন ক্লাস চলাকালীন ক্লাসের একটি অবাধ্য ছেলের অদ্ভুত আচরণে ক্লাসের সমস্ত ছেলেরা হঠাৎ হেসে উঠল। এতে শিক্ষক ছেলেটিকে খুব রাগ করলেন। কিন্তু ছেলেটি এমনি অবাধ্য ছিল যে, সে শিক্ষকের রাগকে উপেক্ষা করে, উল্টো শিক্ষককেই উপহাসের পাত্র বানাতে লাগল। এতে শিক্ষক খুব রেগে গিয়ে ভাবলেন, এই সমস্ত ঘটনাটি বুঝি নরেনের ইশারায় হচ্ছে, সব ঘটনার পিছনে বুঝি নরেনের বুদ্ধিই কাজ করছে।

তিনি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে গায়ের সকল শক্তি দিয়ে নরেনের কান মলতে লাগলেন। তিনি এত জোরে-জোরে কান মলতে লাগলেন যে, অল্প সময়ের মধ্যেই কানের লতি ফেটে ঝর-ঝর করে রক্ত ঝরে পড়তে লাগলো। যন্ত্রণায় কাতর নরেন কোনও কথা না বলে চুপ-চাপ নিজের সকল বই পত্র নিয়ে ক্লাস থেকে সোজা বেরিয়ে গেলেন। দৈবক্রমে ক্লাস থেকে বের হতেই তিনি স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সামনে পড়ে যান। বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন ঐ স্কুলের প্রিন্সিপাল।

রতনে রতন চেনে। বিদ্যাসাগর মহাশয় জানতেন নরেন কোন জগতের ছেলে, কোন ধাতের মানুষ। তিনি নরেনকে এভাবে ক্লাস থেকে বেড়িয়ে যেতে দেখে কারণ জানতে চাইলেন। নরেনের কান থেকে ঝর-ঝর করে ঝরে পড়া রক্ত সব কথা বলে দিচ্ছিল। তিনি নরেনের কাছে সকল ঘটনাটি জানতে চান। নরেন সকল ঘটনা খুলে বললেন। তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় নরেনকে সাথে নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করলেন। তিনি সকলের সামনে সেই শিক্ষককে রাগ করে বললেন, ‘আমি জানতাম আপনি একজন শিক্ষক, এক জন মানুষ। এখন দেখছি আপনি একজন পশু। ঘটনা বিচারের ক্ষমতাই আপনার নেই। রাগে অন্ধ হয়ে আপনি সূর্যের কান টানতে চলছেন? চলুন, আপনার ঐ বইটির যে কোনও পাতা থেকে নরেনকে প্রশ্ন জিজ্ঞাস করুন।

শিক্ষক মহাশয়টি সারা বই থেকে একে-একে অনেক প্রশ্ন করলেন, নরেন সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে গেলেন। এক সময় শিক্ষক মহাশয়টি ক্ষান্ত হয়ে পড়লে বিদ্যাসাগর মহাশয় বললেন, 'এবার নরেন এই বইটি থেকে আপনাকে একটি প্রশ্ন করবে।‘

নিজের অনিচ্ছা স্বত্বেও প্রিন্সিপালের আদেশে নরেন একটি প্রশ্ন করলেন, শিক্ষক মহাশয়টি উত্তর দিতে পারলেন না। তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় ঐ শিক্ষককে সম্মানের সাথে বললেন, 'এতে লজ্জা পাবার কিছু নেই। নরেন সকল প্রশ্নের উত্তর দিতেই এখানে এসেছে। ওর প্রশ্নের উত্তর দেবার লোক খুবই কম। ছেলেটিকে চিনে রাখুন। আপনি এই ছেলেটির শিক্ষক ছিলেন, একদিন এটিই আপনার কাছে এক গর্বের বিষয় হয়ে থাকবে।'