চৈত্র সংক্রান্তির আগে ‘নীল ষষ্ঠী’ পালিত হয়, যেখানে নারীরা শিব ও দুর্গার মঙ্গল কামনায় উপবাস রাখেন। অনেক জায়গায় এটি ‘নীল গাজন’ নামে পরিচিত। গাজনের ঢোল, সন্ন্যাসীর গান আর শিব-আরাধনার উৎসব। গাজন কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালির লোকবিশ্বাস।

এই উৎসবকে ঘিরে তৈরি হয় এক বিশেষ আবেগ, যেখানে ভক্তি, তপস্যা, কল্পসন্ন্যাস ও মাটি-জল-আগুন-আকাশের সঙ্গে মানুষের সংযোগ স্থাপনের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন অঞ্চলে গাজন ভিন্ন ভিন্ন রীতিতে পালিত হয় — কোথাও মাটি খুঁড়ে শিব বের করা হয়, কোথাও কাঁটার ওপর হেঁটে যাওয়া, আবার কোথাও সন্ন্যাসীরা বাণ ফেলে অগ্নি ত্যাগ করেন। চলুন দেখা যাক, গাজন কী এবং বাংলার কোন অঞ্চলে কী ধরনের গাজন পালন করা হয়।

গাজন সাধারণত তিনভাবে পালিত হয়:  শিবের গাজন, ধর্মঠাকুরের গাজন, নীল পুজো ও নীল গাজন

গাজনের সময় দণ্ডী কাটা ও সন্ন্যাসী হওয়াঃ উৎসবের একটি মুখ্য রীতি হল দণ্ডী কাটা। ভক্তরা নিজেদের শিবের সন্ন্যাসী হিসেবে প্রতিস্থাপন করে, তারা চৈত্র মাস জুড়ে সাদা কাপড় পরে, নিরামিষ খায় এবং দণ্ডী কেটে বিভিন্ন মন্দিরে গিয়ে পুজো দেয়।

দণ্ডী কাটা বলতে বোঝানো হয় হাঁটু গেড়ে বা সোজা শুয়ে পড়ে একবারে এক হাত বা গা রেখে সামনের দিকে এগোনো। অনেক ভক্ত শত শত মিটার এভাবে এগিয়ে যান।

বিভিন্ন অঞ্চলে গাজনের ভিন্ন রূপ। বাংলার বিভিন্ন অংশে গাজনের আচার ও উৎসব ভিন্ন ভিন্ন রূপে পালিত হয়। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়া হলো:

১. নদীয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা: ধর্মঠাকুরের গাজনঃ

এই অঞ্চলে গাজন মূলত ধর্মঠাকুরকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। ধর্মঠাকুর এক ধরনের লোকদেবতা যিনি কৃষির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। গাজনের সময় সন্ন্যাসীরা ধর্মঠাকুরের সামনে কঠোর উপবাস পালন করেন। নৃত্য, ধর্মগান, ‘ঢপ’ ও ‘সন্ন্যাসীর পালা’ খুবই জনপ্রিয়।

২. বীরভূম: শিবগাজন ও চারকুলিঃ

বীরভূম জেলার গাজনে দেখা যায় ভয়ঙ্কর সব ব্রত। চারকুলির মাধ্যমে ভক্তরা নিজেদের শরীর কাঁটার মধ্যে ঝুলিয়ে রাখেন। আগুনে হাঁটা, কাঁটার বিছানায় শোয়া ইত্যাদি আচার দেখা যায় এখানে। এটি একদিকে ভক্তির প্রকাশ, অন্যদিকে লোকজ বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।

৩. হুগলি (তারকেশ্বর): সন্ন্যাসী গাজনঃ

তারকেশ্বর শিবমন্দিরে গাজনের সময় হাজার হাজার ভক্ত সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তারা মাথায় করে গঙ্গার জল বহন করে মন্দিরে শিবলিঙ্গে জল অর্ঘ্য দেন। এই সময় সারা রাজ্য থেকে কন্ঠে ‘বোল বোম’ ধ্বনি তুলে আসেন হাজারো শিবভক্ত।

৪. মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া: ভৈরব গাজনঃ

এই অঞ্চলে ভৈরব দেবতা গাজনের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে সন্ন্যাসীরা কাঠের চাকার ওপর উঠে সারা গ্রাম প্রদক্ষিণ করেন। বহুক্ষেত্রে দেখা যায় ছুরি, বল্লম বা কাঁটার সাহায্যে তপস্যা পালন করে থাকেন ভক্তরা। গ্রামের মাঝখানে নির্মিত হয় অস্থায়ী শিবমন্দির।

৫. আগুনে ঝাঁপ দেওয়াঃ

কয়েকটি অঞ্চলে যেমন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূমে দেখা যায় আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার প্রথা। খোলা মাঠে গরম কয়লা ছড়ানো হয় এবং ভক্তরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, যা তারা শিবের নামে ব্রত হিসেবে পালন করেন।

৬. কাটার উপর দিয়ে হাঁটাঃ

কিছু এলাকায়, বিশেষ করে বীরভূম ও পশ্চিম মেদিনীপুরে ধারালো কাটার উপর দিয়ে হাঁটার রীতি প্রচলিত। এটি একটি ধরণের দেহ-নিয়ন্ত্রণ ও আত্মনিবেদন যা শিবের প্রতি নিষ্ঠা ও ভক্তির বহিঃপ্রকাশ।

৭. গায়ে বর্শা ফোটানো ও পীড়ার রীতিঃ

গাজনে শরীরের বিভিন্ন অংশে বর্শা বা লোহার তার ফোটানোর রীতিও রয়েছে। যেমন কান, জিভ বা গাল ভেদ করে বর্শা ঢুকিয়ে নেওয়া। এই রীতিগুলি সাধারণত ধর্মঠাকুরের গাজনের সময় দেখা যায়।

গাজনের নাচ ও গানঃ

গাজনের সময় চারকির নাচ, বাউল গান, গম্ভীরা, ঝুমুর, ইত্যাদি লোকনৃত্য ও সংগীত পরিবেশিত হয়। চারকি হচ্ছে একটি কাঠামো যেখানে সন্ন্যাসীরা ঝুলে নাচ করেন