সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে ইদানীং কিছু ভিডিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হচ্ছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে কিছু মানুষ স্মার্টফোনের সাহায্যে রাস্তা দিয়ে চলতে থাকা ই-রিকশা হঠাৎ থামিয়ে দিচ্ছেন. এই ভিডিওগুলোতে দাবি করা হচ্ছে যে, 'BAT-BMS' নামের একটি চিনা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে কাছাকাছি থাকা যেকোনো ই-রিকশা দূর থেকে (রিমোটলি) বন্ধ করা সম্ভব. এই ঘটনার কারণে ই-রিকশা এবং বৈদ্যুতিক যান (EV) চালকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে. তবে এই ভাইরাল দাবির পেছনের প্রযুক্তিগত সত্যটি কিছুটা ভিন্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ.

'BAT-BMS' অ্যাপ আসলে কী এবং এর কাজ কী?

'BAT-BMS' একটি আসল এবং বৈধ অ্যাপ্লিকেশন, যা চিনের শেনঝেন গ্রীনার্জি টেকনোলজি (Shenzhen Grenergy Technology) নামক একটি কোম্পানি তৈরি করেছে. এটি মূলত একটি 'ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম' (BMS) মনিটরিং অ্যাপ. এই অ্যাপটির প্রধান উদ্দেশ্য হলো ব্লুটুথ-সুবিধাযুক্ত (Bluetooth-enabled) লিথিয়াম ব্যাটারির কার্যক্ষমতা ট্র্যাক এবং পরিচালনা করা. এর মাধ্যমে ব্যাটারির চার্জ, ভোল্টেজ, তাপমাত্রা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়. এছাড়াও এটি ব্যাটারির চার্জিং এবং ডিসচার্জিং প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে.

চলন্ত ই-রিকশা কীভাবে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে?

সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু মানুষ এই অ্যাপটির অপব্যবহার করে 'প্র্যাঙ্ক' বা মজা করছেন. ভারতে ব্যবহৃত অনেক সাশ্রয়ী মূল্যের লিথিয়াম ব্যাটারি প্যাকে ব্লুটুথ-সুবিধাযুক্ত BMS ইউনিট থাকে. উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ব্যাটারিগুলোর বেশিরভাগেরই কোনো পাসওয়ার্ড সুরক্ষা (Password Protection) থাকে না অথবা সেটি অত্যন্ত দুর্বল হয়.

যখন কোনো ই-রিকশা রাস্তা দিয়ে যায়, তখন ১০ থেকে ১৫ মিটারের ব্লুটুথ রেঞ্জের মধ্যে থাকা যেকোনো ব্যক্তি এই অ্যাপের মাধ্যমে সেই অরক্ষিত ব্যাটারির সাথে যুক্ত হতে পারেন. অ্যাপের সাথে যুক্ত হওয়ার পর যদি সেই ব্যক্তি ব্যাটারির 'ডিসচার্জ ফাংশন' (Discharge Function) বন্ধ করে দেন, তবে মোটরে বিদ্যুৎ সরবরাহ সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়. এর ফলে চলন্ত ই-রিকশা রাস্তার মাঝখানেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়.

সব ই-রিকশার ক্ষেত্রেই কি এই ঝুঁকি রয়েছে?

ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোতে সব ই-রিকশা বন্ধ করার দাবি করা হলেও প্রযুক্তিগতভাবে তা সঠিক নয়. এই অ্যাপটি কেবল সেইসব ই-রিকশার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে যেগুলোতে ব্লুটুথ-সুবিধাযুক্ত লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়েছে.

ভারতে এখনো বহু ই-রিকশা ঐতিহ্যবাহী 'লেড-অ্যাসিড' (Lead-acid) ব্যাটারিতে চলে, যেগুলোতে কোনো ব্লুটুথ কানেক্টিভিটি থাকে না. পাশাপাশি, বহু নামী ব্র্যান্ডের বৈদ্যুতিক যানে নিজস্ব সুরক্ষিত সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়, যার ফলে 'BAT-BMS' অ্যাপ সেই ব্যাটারিগুলোর সাথে যুক্ত হতে পারে না.

সাইবার আক্রমণ নয়, বরং সুরক্ষার গাফিলতি

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো উন্নত সাইবার আক্রমণ বা হ্যাকিংয়ের ঘটনা নয়. এটি মূলত ব্যাটারি প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির সুরক্ষাজনিত গাফিলতির একটি বড় উদাহরণ. সস্তা ব্যাটারি ইউনিটগুলো বাজারে ছাড়ার সময় কোনো শক্তপোক্ত নিরাপত্তা মানদণ্ড বা পাসওয়ার্ড সিস্টেম না রাখার কারণেই এই সমস্যা তৈরি হচ্ছে.

রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ গাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে. তাই ই-রিকশা চালক ও মালিকদের সচেতন থাকার এবং নিজেদের যানের ব্লুটুথ সিস্টেমে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড সেট করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা.