Joy Banerjee: ২০১৪ সালে বিজেপিতে তাঁর যোগদানটা ছিল চমকের মত। দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে নরেন্দ্র মোদী আসতে চলেছেন এমন একটা আবহ তৈরি হলেও, তখনও বাংলায় বিজেপিতে যোগদান নিয়ে তেমন উতসাহ ছিল না। কিন্তু টলিউড তারকাদের উল্টো পথে হেঁটে তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে জয় বন্দ্যোপাধ্যায় যোগ দিয়েছিলেন পদ্ম শিবিরেই। তখন অবশ্য টলিউডে তিনি প্রাক্তন অভিনেতার তকমা নিয়েই গেরুয়া পতাকা হাতা তুলেছিলেন। আর বিজেপিতে যোগ দিয়েই সরাসরি একেবারে লোকসভায় প্রার্থী। অমিত শাহ-রাহুল সিনহা পরিকল্পনা করে জয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে দাঁড় করান কঠিন কেন্দ্র বীরভূমে। যে বীরভূমে তখন বিজেপির ভোট ৫ শতাংশেরও কম। তৃণমূলের সাংসদ তথা তাঁর একসময়ের সহকর্মী তথা অভিনেত্রী শতাব্দী রায়কে হারাতে বীরভূমে ঘাঁটি গাড়েন জয়। তখন সেখানে বিজেপির তেমন কোনও সংগঠনই ছিল না। কিন্তু হাল ছাড়েননি জয়। একেবারে সামান্য কয়েকজন দলীয় কর্মীদের নিয়ে বীরভূমের গ্রামে গ্রামে চষতে থাকেন তিনি। তাঁর প্রচারের থিম ছিল ভালবাসা। ১৯৯০ সালে রিলিজ হওয়া তাঁর হিট সিনেমা 'আমি তোমাকে ভালবাসি'-র আই লাভ ইউ গানটা ভোটপ্রচারে সফলভাবে কাজে লাগান জয়। সেখানে তাঁর নাম হয়ে যায় 'আই লাভ ইউ' নেতা।
হার বীরভূম ও উলুবেড়িয়ায়
অন্যদিকে, অনুব্রত মণ্ডল-শতাব্দী জুটি তখন বীরভূমে বেশ জাঁকিয়ে বসেছেন। সেই ভোটে ২ লক্ষ ৩৫ হাজার (সাড়ে ১৮ শতাংশ ভোট) ভোট পেয়ে চমকে দেন জয়। জয়ী শতাব্দী রায় সেখানে পান ৪ লক্ষ ৬০ হাজার, আর দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিপিএমের মহম্মদ ইলাহি পান ৩ লক্ষ ৯৩ হাজার ভোট। তৃতীয় হলেও জয়ের এই বিপুল ভোটপ্রাপ্তি বীরভূমে বিজেপির মনোবল বাড়ায়। তবে ভোটে হারার পর সেভাবে দলীয় কার্যক্রমে দেখা যায়নি তাঁকে। ২০১৬ বিধানসভায় প্রচার করলেও দল তাঁকে প্রার্থী করেনি। বেশ কিছুটা সময় দলের সঙ্গে দূরত্ব রাখার পর জয় বন্দ্যোপাধ্যায় ফের ২০১৯ লোকসভায় প্রচারের আলোয় পেরেন। এবার বিজেপি তাঁকে প্রার্থী করে, আরও কঠিন-উলুবেড়িয়া লোকসভা আসনে। আরও পড়ুন-'কেউ তাঁকে অভিনয়ের জন্য এখন আর ডাকেন না', মৃত্যুর আগে আক্ষেপ ছিল জয় বন্দ্য়োপাধ্যায়ের, কোথায় শেষকৃত্য হবে বিজেপি নেতার
কী বলেছিলেন প্রাক্তন স্ত্রী তথা তৃণমূল কাউন্সিলর অন্যানা বন্দ্য়োপাধ্য়ায়
দলের ভোট বাড়ালেও উলুবেড়িয়া লোকসভা আসনে বিজেপির প্রার্থী হয়ে জয় ব্যানার্জি হারেন তৃণমূলের সাজদা আহমেদের কাছে প্রায় ২ লক্ষ ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে। তবে ২০১৯ লোকসভায় জয়কে আর মিষ্টি নেতা হিসাবে পাওয়া যায়নি। বরং বিতর্কিত মন্তব্য করা, বেঁফাস কথা বলা নেতা হিসাবেই। ২০১৯ লোকসভার পর জয় ক্রমশ সক্রিয় রাজনীতি থেকে হারিয়ে যেতে থাকেন। তাঁর প্রাক্তন স্ত্রী তথা তৃণমূল কাউন্সিলর অনন্যা বন্দ্য়োপাধ্যায় ২০১৭ সালে বলেছিলেন যে জয় তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে হতাশা থেকে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। জয় বন্দ্য়োপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠরা বললেন, রাজনীতি অপেক্ষার খেলা, কথাটা বুঝতে পারলে তিনি অনেক দূর যেতে পারতেন। দু দুবার ভোটে দাঁড়িয়েও দুবারই পারস্ত হতে হয়। দুটি হারই তৃণমূলের মহিলা প্রার্থীদের কাছে। তবে দুটিই ছিল বেশ কঠিন কেন্দ্র।
রাজনীতিতে বিতর্ক
২০১৯ লোকসভা ভোটের আগে বিজেপি প্রার্থী হয়ে জয় বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, "নির্বাচন কমিশন আমাদের হাতে," যা নির্বাচন কমিশনের প্রতি অবমাননাকর হিসেবে গণ্য হয়। এই মন্তব্যের জন্য তাঁকে ক্ষমা চাইতে হয় এবং বিজেপি এই বক্তব্য থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয় । ২০১৯ লোকসভা ভোটের পর রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বের প্রতি তোপ দেগেছিলেন তিনি। দলীয় নেতাদের অবহেলা ও নিরাপত্তা কভার প্রত্যাহারের অভিযোগ তুলে জয় বন্দ্যোপাধ্যায় খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি লেখেন, যেখানে তিনি রাজ্য নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
অভিনেতা থেকে নেতা বনে যাওয়া জয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে অনেকেই বলেন, মিষ্টি নেতা হয়ে পেয়েছিলেন ভালবাসা, ঝাঁঝালো হতে গিয়েই করেন ভুল। আর তাই হয়তো নামটা জয় হলেও রাজনীতিতে জয়টা অধরাই থেকে যায় তাঁর।
এক নজরে নির্বাচনী যুদ্ধে জয় বন্দ্যোপাধ্যায়
২০১৪ বীরভূম লোকসভা নির্বাচন
শতাব্দী রায় (তৃণমূল): ৪,৬০,৫৬৮ (৩৬.০৯%)
মহম্মদ ইলাহি (সিপিএম): ৩,৯৩,৫০৫ (৩০.৮২%)
জয় ব্যানার্জি (বিজেপি): ২,৩৫,৭৫৩ (১৮.৪৭%)
শতাব্দী রায় (তৃণমূল) জয়ী ৬৭ হাজার ভোটে
২০১৯ উলুবেড়িয়া লোকসভা নির্বাচন
সাজদা আহমেদ (তৃণমূল): ৬,৯৪,৯৪৫ (৫৩%)
জয় ব্যানার্জি (বিজেপি): ৪,৭৯,৫৮৬ (৩৬.৫৮%)
মাকসুদা খাতুন (সিপিএম): ৮১,৩১৪ (৬%)
সাজদা আহমেদ (তৃণমূল) জয়ী ২ লক্ষ ১৫ হাজার ভোটে