মহাবীর জয়ন্তী জৈন ধর্মের অন্যতম পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই দিনটি মহান তীর্থঙ্কর মহাবীরের জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়। তিনি ছিলেন জৈন ধর্মের ২৪তম এবং সর্বশেষ তীর্থঙ্কর। তার আদর্শ, নীতিমালা ও জীবনদর্শন শুধু জৈন সম্প্রদায়ের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।
মহাবীর জয়ন্তী পালিত হয় চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৯ সালে বিহারের বৈশালীর কাছে কুন্ডলপুর গ্রামে এক রাজকীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মহাবীর। তার পিতার নাম সিদ্ধার্থ ও মাতার নাম তৃশলা। তার মূল নাম ছিল বর্ধমান। জন্মের পূর্বে তৃশলা দেবী ১৬টি শুভ স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা একটি বিশিষ্ট আত্মার আগমনের ইঙ্গিত ছিল।
রাজকীয় আরাম-আয়েশের জীবন ত্যাগ করে তিনি আত্মজ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে কঠোর সাধনায় নিযুক্ত হন। ৩০ বছর বয়সে তিনি সংসার ত্যাগ করেন এবং ১২ বছর অরণ্যে তপস্যা করেন। এই সময় তিনি নীরব থাকতেন এবং কঠোর ব্রহ্মচর্য, উপবাস ও ধ্যানের মাধ্যমে আত্মজ্ঞান অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যান। শেষপর্যন্ত তিনি 'কেবল জ্ঞান' লাভ করেন, যা একজন তীর্থঙ্করের চূড়ান্ত জ্ঞানাবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। এরপর তিনি জৈন ধর্মের মূল দর্শন প্রচার শুরু করেন।
মহাবীরের শিক্ষাদর্শন: মহাবীর স্বামী অহিংসা, সত্য, অচৌর্য (চুরি না করা), ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ (আসক্তিহীনতা) এই পাঁচটি মূল নীতিকে তার ধর্মীয় দর্শনের কেন্দ্রে রেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রতিটি জীবিত প্রাণী আত্মার অধিকারী এবং তাই তাদের প্রতি সহানুভূতি ও সম্মান দেখানো উচিত। তিনি সকল প্রকার হিংসার বিরোধিতা করেন, এমনকি অজান্তে কোনো ক্ষতিও যেন না হয়, তার প্রতি দৃষ্টি রাখতেন।
তার দার্শনিক চিন্তাগুলির মধ্যে আত্মশুদ্ধি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নির্লিপ্ত জীবনযাপনের গুরুত্ব ছিল অন্যতম। তিনি কেবল বাহ্যিক আচরণ নয়, অন্তর্জগতের শুদ্ধতাকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিতেন। মহাবীরের এই দর্শন আজও বহু মানুষকে প্রভাবিত করে চলেছে।
এই দিনটি জৈন ধর্মাবলম্বীদের জন্য আত্মশুদ্ধি, ভক্তি ও ধর্মচর্চার একটি বিশেষ সুযোগ। মহাবীর জয়ন্তীতে মন্দিরে বিশেষ পূজা, প্রভাতফেরী, ধর্মীয় বক্তৃতা এবং দানধর্মের আয়োজন করা হয়। অনেকেই এই দিনে উপবাস করেন এবং মহাবীর স্বামীর শিক্ষাগুলি নিয়ে ধ্যান ও মনন করেন।
বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন এই দিনে জনসেবামূলক কাজ যেমন – রক্তদান শিবির, বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা, খাদ্য বিতরণ ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে। শিশু-কিশোরদের মাঝে মহাবীরের নৈতিক শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়। অনেক জৈন পরিবার এই দিনটিকে দানের মাধ্যমে পালন করেন, কারণ মহাবীর অহিংসা ও দয়া-দাক্ষিণ্যের আদর্শ ছিলেন।
বর্তমান যুগে যখন হিংসা, লোভ, ভোগবিলাস ও আত্মকেন্দ্রিকতা সমাজকে গ্রাস করছে, তখন মহাবীর স্বামীর শিক্ষা আমাদের জন্য এক মূল্যবান পথনির্দেশ। তার প্রচারিত অহিংসার আদর্শ কেবল শারীরিক হিংসার বিরোধিতা নয়, বরং ক্ষমা ও শান্তির বার্তা বহন করে।
বিশ্ব জুড়ে সংঘাত, যুদ্ধ ও সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষিতে মহাবীরের দর্শন এক গভীর মানবতাবাদী চেতনার জন্ম দেয়। তার জীবন আমাদের শেখায় – কিভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে, কামনা-বাসনা ও ভোগের বাইরে গিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ জীবন যাপন করা যায়।