Lok Sabha Elections 2024 WB: বাংলায় এক্সিট পোল মিলতে হলে যে ১২টি আসনের ফল বড় ফ্যাক্টার হতে চলছে
Sukanta Majumdar, Rachana Banerjee, Arjun Singh. (Photo Credits: X)

পার্থ প্রতিম চন্দ্র: দেশের সব কটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই লোকসভা নির্বাচন ২০২৪-এর এক্সিট পোলে (Exit Poll 2024) দেখানো হয়েছে বাংলায় এবার তৃণমূলের থেকে অন্তত ৮-১০টি বেশী আসনে জিতবে বিজেপি। তিন বছর আগে বিধানসভা ভোটে হারের জ্বালা মিটিয়ে এবার লোকসভা নির্বাচনে দিদির দলকে ধরাশায়ী করবে মোদীর দল। এক্সিট পোলগুলির পূর্বাভাস এমনই দেখাচ্ছে। যদিও ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনেও প্রায় সব কটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এক্সিট পোল বা সমীক্ষায় দেখানো হয়েছিল, বাংলায় বিজেপি দুশোর কাছাকাছি আসন নিয়ে প্রথমবার ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু হয়েছিল ঠিক উল্টোটা। দিদি ঝড়ে উড়ে গিয়েছিল মোদী শিবির। কিন্তু এবার কী হবে?

সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত সব কটি এক্সিট পোলের গড় করলে দাঁড়াচ্ছে রাজ্যের ৪২টি আসনের মধ্যে বিজেপি অন্তত ২৫-২৬টি আসনে জিততে চলেছে, তৃণমূল সেখানে জিতবে ১৪-১৫টি-তে,বাম- কংগ্রেস জোট পেতে পারে ২-৩টি কেন্দ্র। এক্সিট পোলগুলিতে বলা হয়েছে, বিজেপি গতবার তাদের জেতা অধিকাংশ আসন তো ধরে রাখবেই সঙ্গে তৃণমূলের গড় হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রগুলিতেও গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেবে।

তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা আবার এই এক্সিট পোল উড়িয়ে দাবি করছেন, তারা অন্তত ২৫-২৬টি আসনে জিতবেনই, এক্সিট পোল গত বিধানসভা ভোটের মতই ভুল হবে। ভোট শেষে বিজেপির আবার দাবি বাংলায় তারা অন্তত ২৮-৩০টি আসনে জিতছে।

তাহলে কোনটা মিলবে? এর উত্তর লুকিয়ে রাজ্যের ১২টি লোকসভা কেন্দ্রে। এই কেন্দ্রগুলির ফলই ঠিক করে দিতে পারে বাংলায় ফল কী হতে চলেছে---

জানুন সেই ১২টি লোকসভা আসন কী কী---

১) ব্যারাকপুর (গতবার জয়ী বিজেপি): গতবার বিজেপি বাংলায় ১৮টি আসনে জিতে ইতিহাস গড়েছিল। বিজেপি-র এই ইতিহাসের পিছনে অজুর্ন সিংয়ের জয় বড় ভূমিকা নিয়েছিল। অর্জুন কম ব্যবধানে হারিয়েছিলেন বিজেপি-র দীনেশ ত্রিবেদীকে। বাংলায় এবার তৃণমূলের থেকে বেশী আসনে জিততে হলে ব্যারাকপুরে অর্জুনকে জিততেই হবে। অন্যদিকে, পার্থ ভৌমিক জিতে গেলে বাংলায় বিজেপির পক্ষে ভাল ফল করা কঠিন হবে।

২) বহরমপুর (গতবার জয়ী কংগ্রেস): গত ২৫ বছর পর ধরে কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বহরমপুর থেকে অনায়াসে জিতে আসছেন। এবার অধীরের কাজটা সবচেয়ে কঠিন মনে করা হচ্ছে। কারণ এবার তাঁর কেন্দ্রে কংগ্রেসের কোনও বিধায়ক নেই। ইরফান পাঠান ছক্কা হাঁকিয়ে জয় ছিনিয়ে নিলে তৃণমূলের সুবিধা হবে, তাদের গড়ে কোনও আসনে বিজেপি জিতে গেলে এখান থেকে সেটা মেকআপ হয়ে যাবে।

৩) হুগলি (গতবার জয়ী বিজেপি): লকেট চট্টোপাধ্যায় বনাম রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। জয়ের রচনা লিখবেন লকেট? নাকি জয়ের লকেট গলায় পরবেন রচনা? এই প্রশ্নটার ওপর রাজ্যের সামগ্রিক ফলের একটা বড় উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে। হুগলির মত আসন বিজেপি ধরে রাখতে না পারলে তাদের পক্ষে বাংলায় ২০টি-র বেশী আসনে জেতার কাজটা কঠিন হবে।

৪) বালুরঘাট (গতবার জয়ী বিজেপি): বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের কেন্দ্র। ২০১৯ লোকসভায় সুকান্ত এখান থেকে তৃণমূলের অর্পিতা ঘোষকে হারিয়ে প্রথমবার সাংসদ হয়েছিলেন। এবার সুকান্তর বিরুদ্ধে তৃণমূলে দাঁড় করায় স্থানীয় জনপ্রিয় অভিজ্ঞ নেতা বিপ্লব মিত্র-কে। সুকান্ত এই আসন জিততে না পারলে বাংলায় বিজেপির আসন ১৭ পাড় করা কঠিন হবে।

৫) বর্ধমান দুর্গাপুর (গতবার জয়ী বিজেপি): বিজেপির প্রার্থী এখানে দিলীপ ঘোষ। বিপক্ষে তৃণমূলের কীর্তি আজাদ। দিলীপ জয়ের কীর্তি না গড়লে রাজ্যে বিজেপির ২০টি-র বেশী আসনে জেতা কঠিন হবে।

৬) কৃষ্ণনগর (গতবার জয়ী তৃণমূল): তৃণমূলের গড়। মহুয়া মৈত্র এই কেন্দ্রে অমৃতা রায়ের কাছে হারলে বাংলায় তৃণমূলের আসন ১৫-র কমে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে।

৭) তমলুক (গতবার জয়ী তৃণমূল) : শুভেন্দু অধিকারীর গড়। বাংলায় বিজেপি-কে ১৮-র বেশী আসনে জিততে হলে তমলুক অভিজিত গঙ্গোপাধ্য়ায়-কে জিততেই হবে। আর এখান থেকে তৃণমূলের দেবাংশু ভট্টাচার্য অঘটন ঘটালে তৃণমূল রাজ্যে ২৬-টির বেশী আসনে জিততে পারে।

৮) হাওড়া (গতবার জয়ী তৃণমূল): তৃণমূলের গড়। গোটা দেশ-রাজ্যে যাই হয়ে যাক হাওড়ায় বরাবর ভোটারদের ভালবাসা-আশীর্বাদ পেয়ে এসেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এবার একটা অঘটনের আশঙ্কায় বুক বেঁধেছেন বিরোধীরা। হাওড়ায় প্রাক্তন তারকা ফুটবলার প্রসূণ বন্দ্যোপাধ্যায় হেরে গেলে রাজ্যে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ১৫-র নিচে নামতে পারে।

৯) বাঁকুড়া (গতবার জয়ী বিজেপি): কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুভাষ সরকারের কেন্দ্র। বিজেপি-কে এই আসন ধরে রাখতেই হবে। না হলে তারা সম্ভবত রাজ্যের তৃণমূলের সংখ্যাকে ছাপিয়ে যেতে পারবে না।

১০) আসানসোল (২০১৯-এ জয়ী বিজেপি): দার্জিলিং বাদ দিলে নিজের শক্তিতে লড়ে বিজেপি-র জেতা বাংলায় প্রথম লোকসভা আসন হল আসানসোল। বাবুল সুপ্রিয় দলবদলের পর ইস্তফা দিলে উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতেছিলেন তৃণমূলের শত্রুঘ্ন সিনহা। এবার শত্রুঘ্নের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী অভিজ্ঞ সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়া। আসানসোলের মত নিজেদের সুবিধাজনক কেন্দ্র নিজেদের দখলে আনতে মরিয়া বিজেপি, কারণ এখানে জিততে পারলে অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা যাবে। অন্যদিকে, তৃণমূলের চেষ্টা থাকবে আসানসোল ধরে রেখে বিজেপিকে জোর ধাক্কা দিতে।

১১) পুরুলিয়া (গতবার জয়ী বিজেপি): প্রেস্টিজ ফাইট। নির্বাচনের আগে অনেকটা এগিয়ে ছিল বিজেপি। কিন্তু প্রচার যত এগিয়েছে ততই দুই ফুলের ব্যবধান কমেছে। পুরুলিয়ার ফল অনেকটাই আঁচ দিয়ে দেবে রাজ্যের ফল কার পক্ষে যেতে চলেছে।

১২) মালদহ দক্ষিণ (গতবার জয়ী কংগ্রেস): গতবার কংগ্রেস গণিখান চৌধুরীর গড় থেকে অল্প ব্য়বধানে জিতেছিল। এক্সিট পোলে বলার মত ফল করতে হলে এবার এখান থেকে বিজেপিকে জিততেই হবে, তা না হলে বাংলায় ২৫-২৬টি আসন জেতা মুখের কথা হবে না গেরুয়া শিবিরের কাছে।

হিসেব-নিকেশ

সম্ভাব্য হিসেব (তৃণমূল)- বিজেপি-কে ১৫-র নিচে নামাতে হলে, তৃণমূলকে বিজেপির জেতা গতবারের অন্তত ৫-৬টি-তে জিততেই হবে। কারণ কাঁথি, তমলুক, আরামবাগের মত আসন এবার তৃণমূলের পক্ষে ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এমনকি কৃষ্ণনগর, হাওড়ার মত আসনেও কঠিন লড়াই। তবে গতবারের থেকে উত্তরবঙ্গে কিছুটা হলেও সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছে তৃণমূল।

সম্ভাব্য হিসেব (বিজেপি)- বাংলায় ২৫টি আসন বা তার বেশী পেতে হলে বিজেপি-কে কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগণা থেকে অন্তত ৮টি বা তার আসনে জিততেই হবে। কারণ গতবারের মত জঙ্গলমহল ও উত্তরবঙ্গের সব কটি আসনে নাও জিততে পারে পদ্ম শিবির।

সম্ভাব্য হিসেব (জোট)- বাম কংগ্রেস জোটের পক্ষে সেরা তিন বাজি বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদা দক্ষিণ। ম্যাজিকের অপেক্ষায় থাকতে হবে রায়গঞ্জ, যাদবপুরে।