BJP MP Samik on London (Photo Credit: X@ANI)

পার্থ প্রতিম চন্দ্র: ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে হারের ভুল থেকে কি এতদিনে শিক্ষা নিল বিজেপি? আদি বনাম নয়া বিতর্কে এবার আর দলছুট নয়, দলের পুরনো নেতাদেরই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে পদ্মশিবির? বাংলা বিজেপির সিংহাসনে বসতে চলেছেন রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)। নিজেদের একক ক্ষমতায় জেতা বাংলায় দলের প্রথম বিধায়ক শমীকের নেতৃত্বেই ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে লড়তে চলেছে গেরুয়া শিবির। দলের দীর্ঘদিনের কর্মী শমীককে আনা হচ্ছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়ে যাওয়া সুকান্ত মজুমদারের পরিবর্তে। রাহুল সিনহা, দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার-দের পর এবার রাজ্য বিজেপির হটসিটে বসতে চলেছেন দলের লড়াকু ও তাত্ত্বিক নেতা শমীক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সবুজ সঙ্কেতের পর বঙ্গ বিজেপি সভাপতি পদে শমীক ভট্টাচার্য-র বসা নিয়ে আর তেমন কোনও অনিশ্চয়তা নেই। এখানেই উঠছে প্রশ্ন, শমীকের মত পুরনো নেতাদের রাজ্য সভাপতি করে, কি আসলে বার্তা দেওয়া হল শুভেন্দু অধিকারীদের মত তৃণমূল ছেড়ে আসা নেতাদের ওপরেই?  তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে আসা নেতাদের ওপর আস্থা হারিয়ে অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা-রা পুরনো যোদ্ধাদের ওপর ভরসা করতে শুরু করলেন, তা শমীককে বাংলার দায়িত্বে এনে বুঝিয়ে দেওয়া হল। এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞমহল।

তৃণমূল থেকে আসা নয়, আদি বিজেপি নেতাদের প্রাধান্য

এতদিন শাহ-নাড্ডার আমলে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গুরুত্ব দিত, তৃণমূল ছেড়ে আসা নেতাদের। রাজীব বন্দ্য়োপাধ্যায় থেকে তাপস চট্টোপাধ্যায়, বৈশালী ডালমিয়া, সত্যজিত বিশ্বাস-দের মত বিধায়ক, মন্ত্রী-রা তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়ে বেশ গুরুত্ব পেয়েছিলেন। কিন্তু ভোটে মিটতেই বিজেপিকে শূন্য করে যে যার ঘরে ফিরেছেন। এতে বাংলায় বিজেপির শুধু আসন কমেনি, সাধারণ ভোটারদের কাছে ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্থ, সঙ্গে পুরনো আস্থাভাজন কর্মীদেরও হতাশা বেড়েছে। কিন্তু শমীক দায়িত্বে আসার পর বাংলায় বিজেপিতে তৃণমূল ছেড়ে আসান নেতাদের দাপট কমতে পারে। শমীক বাংলায় ২০১৬ বিধানসভা, ২০১৯ লোকসভা ও ২০২১ বিধানসভা ভোটে দাঁড়িয়ে হারলেও তাঁর দলের প্রতি আনুগত্য আর কর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা তাঁকে বাংলায় বিজেপির সিংহাসনে বসাচ্ছে।

শমীককে আনার পিছনে অঙ্ক

শমীকের দলের ওপর ভালবাসা, পরিশ্রম, গুছিয়ে কথা বলতে পারা নিয়ে কোনওদিনই সন্দেহ ছিল না, কিন্তু ২০১৯ লোকসভা ভোটের পর বাংলায় যখন বিজেপির দারুণ সময়, সে সময় তিনি যে পিছনের সারিতে চলে গিয়েছিলেন তা নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। ২০১৯ লোকসভায় হারের পর ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে রাজারহাট-গোপালপুর আসনে তৃণমূলের অদিতি মুন্সির বিরুদ্ধে ২৫ হাজারের বেশি ভোটে পরাস্ত হওয়ার ধাক্কাটা শমীককে রাজ্য রাজনীতিতে কিছুটা পিছিয়ে দেয়। কিন্তু হার, বিতর্ক কখনই শমীককে দমিয়ে দিতে পারেনি। দিলীপ ঘোষের মত দলে পুরনো হয়েও কখনই দলের বিরুদ্ধে তোপ দাগেননি। কখনও কোনও পদের জন্য দিল্লিতে দরবার করেননি। বরং কখনও দলকে অস্বস্তিতে না ফেলে সব ইস্য়ুতে রাজ্যে তৃণমূল সরকারকে ভালভাবে আক্রমণ করেছেন। দলের নেতাদের মধ্যে শমীককে নিয়ে কারও তেমন কোনও বিরোধিতা নেই। দলের আদি ও নব্যদের মত সেতুবন্ধনের কাজটা করার ব্যাপারেও তিনি সেরা মানুষ হতে পারেন। এই ভাবনা থেকেই তাঁকে বঙ্গ বিজেপির দায়িত্ব দিচ্ছেন শাহ-নাড্ডা-রা।

কোথায় নম্বর পেলেন শমীক

২০২৪ সালের এপ্রিলে শমীককে রাজ্যসভায় পাঠায় গেরুয়া শিবির। সংসদের উচ্চকক্ষে শমীকের কথা, কাজ প্রশংসা আদায় করে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বর মধ্যে। ক মাস আগে অপরাশেন সিঁদুর-এর সাফল্য়ের কথা তুলে ধরতে শমীককে বিদেশে পাঠিয়েছিল মোদী সরকার। সুকান্তর পরিবর্তে তাই শিক্ষিত, 'দলের তাত্ত্বিক' নেতার ওপরেই ভরসা রাখলে গেরুয়া শিবির।

শমীকের নির্বাচনী রেকর্ড

২০১১ বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি একটা আসনেও জেতা তো দূরের কথা, সব জায়গাতেই জামানত জব্দ হয়। কিন্তু তিন বছর বাদে শমীকই বাংলায় বিজেপির ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেন। সিপিএমের জেতা আসন বসিরহাট দক্ষিণে ২০১৪ সালে বিধায়কের মৃত্য়ুর কারণে উপনির্বাচন হয়। তৃণমূলে সেই আসনে প্রার্থী করে তারকা ফুটবলার দীপেন্দু বিশ্বাস-কে। সেই উপভোটের মাস চারেক আগেই বসিরহাট লোকসভা ভোটে দাঁড়িয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী শমীক ভট্টাচার্য। তৃণমূলের ফুটবলার-নেতা দীপেন্দু প্রথমবার দাঁড়িয়ে বিধায়ক হবেন, এমনটাই অনেকেই মনে করিয়েছিলেন, কিন্তু পোড়খাওয়া শমীককে বিজেপি সেখানে প্রার্থী করে সফল হয়। খেলা ঘুরিয়ে বসিরহাট দক্ষিণ উপনির্বাচনে জিতে বাংলা বিধানসভায় বিজেপির খাতা খোলেন। মাত্র তিন বছরের মধ্যে শমীক দলের ৬৪ হাজার ভোট বাড়িয়েছিলেন। তবে দু বছর বাদে শমীক সেই আসন আর ধরে রাখতে পারেননি।

ভোটে রেকর্ড: ১-৩

২০১৬ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের দীপেন্দু বিশ্বাস ২৪ হাজার ভোটে হারান শমীক ভট্টাচার্যকে। এরপর ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির জয়জয়কারের মাঝে দমদম কেন্দ্রে শমীক হারেন সৌগত রায়ের বিরুদ্ধে। এরপর ২০২১ বিধানসভা ভোটে তিনি হারেন রাজারহাট-গোপালপুর থেকে তৃণমূলের অদিতি মুন্সির কাছে। এরপর ২০২৪ সালের এপ্রিলে শমীককে রাজ্যসভায় পাঠায় বিজেপি। ২০১৪ বসিরহাট দক্ষিণ উপনির্বাচনে জয়। এরপর ২০১৬ বিধানসভা, ২০১৯ লোকসভা ও ২০২১ বিধানসভা ভোটে হার। ২০২৪ লোকসভা ভোটে তাঁকে প্রার্থী করেনি দল।