পার্থ প্রতিম চন্দ্র: এবার নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে এনডিএ ৪০০টি-র বেশী আসন জিততে চলেছে। নির্বাচনী প্রচারে এই কথাটাই স্লোগান হিসেবে ক্রমাগত বলে চলেছেন বিজেপির কর্মী সমর্থকরা। আবকি বার, ৪০০ পার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও জোর দিয়ে বলেছেন বিজেপি ৩৭৫-টির বেশী আসনে জিতবে। তবে বিরোধীরা বিজেপির এই দাবি উড়িয়ে দিচ্ছে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি-র নেতারা বারবার বলছেন, নির্বাচনের আগে ইডি, সিবিআই সহ যাবতীয় শক্তি বিরোধীদের ওপর প্রয়োগ করেও বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জায়গা নেই। তাই বিরোধীদের দুই মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল, হেমন্ত সোরেনের গ্রেফতার পর দেশের রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
এবার দেখা যাক অঙ্ক কী বলছে। দেশের ৫৪৩টি লোকসভা আসনের মধ্যে বিজেপি লড়তে চলেছে ৪৪৩টি-তে। বাকি ১০০টি আসনে এনডিএ-র শরিক দলেরা লড়বে। বিহারে জেডি (ইউ), এলজেপি। মহারাষ্ট্রে একনাথ শিন্ডের শিবসেনা, অজিত পাওয়ারের এনসিপি। কর্ণাটকে জেডি (ইউ), উত্তরপ্রদেশে আপনা দল, ঝাড়খণ্ডে অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, মিজোরামে মিজো ন্যাশনল ফ্রন্ট, অসমে অগপ, তামিলনাড়ুতে টিএমকে, পিএমকে, অন্ধ্রপ্রদেশে টিডিপি-জনসেনা পার্টি। বেশ কিছু রাজ্যে শরিকদের সঙ্গে জোট গড়ে লড়ছে বিজেপি। তবে বাংলা, দিল্লি, হরিানা, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান সহ বেশ কিছু রাজ্যে একাই সব কটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে লড়ছে নরেন্দ্র মোদী-র দল।
অঙ্ক বলছে বিজেপি যে ৪৪৩টি আসনে লড়ছে তার মধ্যে ৫০-৬০টি আসনে তারা এর আগে কখনও জয়ের মত জায়গায় ছিল না। এমন আসন পশ্চিমবঙ্গে আছে ১৮টি। তবে এটাও ঠিক ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনেও এমন বেশ কিছু আসন ছিল, যেখানে বিজেপি কখনও জেতেনি, বা জেতার মত জায়গায় ছিল না। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী সুনামিতে সেসব 'অসম্ভব'আসনেও জিতে বিজেপি ৩০০-র গণ্ডি টপকে গিয়েছিল। এবার প্রশ্ন, তেমন 'নামুমকিন কো মুমকিন'করার মত ম্যাজিক এবারও দেখাতে পারবেন কি নরেন্দ্র মোদী।
আসুন দেখে নেওয়া যাক, দু পক্ষের হিসেব
বিজেপির পক্ষ-
১) হিন্দি বলয়ে আগের মতই প্রায় সব আসনে জয়ের ধারা অব্যাহত থাকছে। মানে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, দিল্লি, হরিয়ানা-র মত রাজ্যে বিজেপির আসন গতবারের মতই ১০০ শতাংশ থাকবে।
২) পশ্চিম ভারতে গুজরাট, রাজস্থানেও এবারও প্রায় সব আসনেই বিজেপি জিতবে।
৩) উত্তরপ্রদেশে গতবার এনডিএ জিতেছিল ৬৮টি আসনে, এবার সেটা ৭৫ পার হবে।
৪) ওডিশা, অসম, উত্তর পূর্ব ভারত থেকে আরও অন্তত ৭টি-র বেশী আসনে জয় আসবে।
৫) বাংলায় এবার ২৫টি আসন জিতবে বিজেপি। গতবারের থেকে অন্তত ৮টি বাড়াতে পারবে দল।
৫) দক্ষিণ ভারতে এবার মোদী ঝড় উঠবে। কর্ণাটকে রাজ্যের ক্ষমতা হাতছাড়া হলেও সেখান থেকে ২২টি-র বেশী আসনে জয় আসবে। সেখানে গতবার বিজেপি পেয়েছিল ২৫টি আসন। তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশ, তেলাঙ্গানা থেকে অন্তত ১৮টি লোকসভা আসনে জয় আসবে। সঙ্গে কেরলেও খাতা খুলবে দল।
৬) মহারাষ্ট্রে কিছু আসন কমলেও সমস্যা হবে না। কারণ পঞ্জাবে এবার আসন বাড়িয়ে নেবে বিজেপি।
মন্তব্য: এই হিসেব ধরলে বিজেপি ৩৪০টি-র বেশী আসন পেতে পারে। তবে ৩৭৫ পাড় হওয়া এরপরেও খুবই কঠিন।
বিরোধীদের হিসেব-
১) বিজেপি গতবারের মত যে চারটি রাজ্যে সব কটি আসনে জিততে পারবে না। সেগুলি হল- ১) দিল্লি, ২) হরিয়ানা, ৩) গুজরাট ৩) ত্রিপুরা। এখান থেকে অন্তত ১-২টি করে আসন কমবে বিজেপির। সেখানে এই রাজ্যে ১০০ শতাংশ আসনেই জিতেছিল বিজেপি। এই চার রাজ্যের মধ্যে দিল্লি ও হরিয়ানা-য় কংগ্রেস, ও আপের মধ্যে জোট হওয়ায় পদ্ম শিবিরের ওপর চাপ বাড়ছে। গোষ্ঠী কোন্দলের কারণে গুজরাটে দুটি লোকসভা আসনে চাপে আছে পদ্ম শিবির। তিপরা মোথার সমর্থন থাকলেও পশ্চিম ত্রিপুরা আসনে বিজেপি পিছিয়ে রয়েছে। সেখানে বিজেপির প্রার্থী প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব। যে বিপ্লবের বিরুদ্ধে দলের একাংশের ক্ষোভ রয়েছে।
২) বিজেপির আসন গতবারের চেয়ে নিশ্চিতভাবেই কমবে-১) পশ্চিমবঙ্গ, ২) মহারাষ্ট্র, ৩) বিহার, ৪) তেলাঙ্গানা।
৩) বিজেপি বড় ধাক্কা খাবে কর্ণাটকে। সেখানে অন্তত গতবারের জেতা ১০টি লোকসভা আসনে হার নিশ্চিত বিজেপি-র।
৪) চন্দ্রবাবু নাইডু-র সঙ্গে হাত মিলিয়ে অন্ধ্রে ২-৩টি আসনে জিতলেও তামিলনাড়ু, কেরল, পুদুচেরিতে এবারও বিজেপিকে খালি হাতে ফিরতে হবে।
বিরোধীদের কাছে হিসেবে স্পষ্ট-বিজেপি-কে ২৭২-র নিচে নামাতে হলে এই চারটি শর্ত পালন করতে হবে--
১) কর্ণাটকে বিজেপিকে ১০-র নিচে বেঁধে রাখতে হবে।
২) মহারাষ্ট্রে ২০-র নিচে নিয়ে যেতে হবে।
৩) বাংলায় দশটি লোকসভা আসনের নিচে মোদীর দলকে নিয়ে যেতে হবে।
৪) উত্তরপ্রদেশে ৬০টি লোকসভা আসনের কমে রাখতে হবে।
৫) বিহারে ৩০-র নিচে রাখতে হবে।
মন্তব্য- সাধারণ অঙ্কের হিসেবে এটা অসম্ভব নয়। কারণ কর্ণাটক, বিহার, মহারাষ্ট্র, বাংলায় বিজেপি যে কিছুটা চাপে তা পরিষ্কার। তবে নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে ততই প্রচারের ধার বাডা়বে বিজেপি। নরেন্দ্র মোদী একবার প্রচারে নামলে যে সব হিসেব উল্টে যায়, তা বারবার প্রমাণ হয়েছে। তবে সেটা কী এবারও হবে? মোদী সরকারের ওপর কিন্তু ১০ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়া রয়েছে।