তেল আভিভে নামার পরিকল্পনা ভেস্তে যেতেই কি ফ্লাইদুবাই বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ করেছিলেন ওমানি পাইলট
মাঝআকাশে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমানে ঘটেছে এক রোমহর্ষক ঘটনা। বিমানটিতে প্রায় ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের অধিকাংশই ইসরায়েলি নাগরিক। ইতালীয় সংবাদমাধ্যম 'করিয়ারে দেল্লা সেরা'-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ওমানি সহ-পাইলট হাম্মাম আল-হামামির এক ভয়াবহ পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর বিমানটির দুটি ইঞ্জিনই বন্ধ করে দেওয়ার মতো আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেন।
Flydubai CoPilot: মাঝআকাশে ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বোয়িং ৭৩৭ বিমানে ঘটেছে এক রোমহর্ষক ঘটনা। বিমানটিতে প্রায় ১৭৪ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের অধিকাংশই ইসরায়েলি নাগরিক। ইতালীয় সংবাদমাধ্যম 'করিয়ারে দেল্লা সেরা'-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ওমানি সহ-পাইলট হাম্মাম আল-হামামির এক ভয়াবহ পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর বিমানটির দুটি ইঞ্জিনই বন্ধ করে দেওয়ার মতো আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেন। তবে ককপিটে থাকা রক্তাক্ত ক্যাপ্টেন এবং কয়েকজন সাহসী যাত্রীর অসম সাহসী ভূমিকায় শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছেন বিমানে থাকা সকল যাত্রী।
পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় মরভূমিতেই ক্র্যাশের চেষ্টা
ইজরায়েলি গোয়েন্দা সূত্র উদ্ধৃত করে ইতালীয় সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহ-পাইলট আল-হামামির মূল পরিকল্পনা ছিল ভারতীয় মূলের প্রধান পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে হত্যা করা। এরপর প্লেনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিমানটিকে তেল আবিবের একটি উঁচু ভবনে আছড়ে ফেলার ছক ছিল তার। তবে মূল পরিকল্পনায় ব্যর্থ হয়ে তিনি পুরো বিমানটিকে মরভূমিতেই আছড়ে ফেলার চেষ্টা করেন। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, আল-হামামি বিমানের দুটি ফুয়েল সুইচই “Run” থেকে “Cutoff” মোডে সরিয়ে ইঞ্জিন নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিলেন কিনা।
প্রার্থনার ভান ও অতর্কিত হামলা
ঘটনার বিবরণ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, টেক অফের অবস্থায় আল-হামামি ককপিটে প্রার্থনার ভান করেন। এরপরই ককপিটে থাকা ইমার্জেন্সি ক্র্যাশ অ্যাক্স (কুড়াল) বের করে পিছন থেকে হঠাৎ ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথম কয়েকটি আঘাতের পর ক্যাপ্টেন ভেবেছিলেন বিমানের কোনো ভাঙা যন্ত্রাংশ তার ওপর পড়েছে। কিন্তু একের পর এক ধারালো অস্ত্রের আঘাত আসতে থাকলে তিনি বুঝতে পারেন যে তার ওপর হামলা হয়েছে। ককপিটের ভিতরেই তাদের মধ্যে জীবনপণ ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
হামলায় ক্যাপ্টেনের মাথা গুরুতর ক্ষতবিক্ষত হয় এবং তার একটি হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সহ-পাইলট ককপিটের দরজা আটকে দেওয়ার চেষ্টা করলেও রক্তাক্ত অবস্থাতেই ক্যাপ্টেন পুনরায় দরজা খুলে দিতে সক্ষম হন।
৩০ সেকেন্ডে ১৬ হাজার ফুট পতন
ককপিট থেকে আসা বিকট শব্দ শুনে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিমানে থাকা দুজন অফ-ডিউটি পাইলটকে বিষয়টি জানান যাত্রীরা। ককপিটের দরজা খুলতেই বেশ কয়েকজন যাত্রী দেখতে পান, ক্যাপ্টেন মাচ্ছার রক্তে ভেসে যাচ্ছেন। ঠিক এই সময়ই সহ-পাইলট আল-হামামি বিমানের অটোপাইলট সিস্টেম বন্ধ করে দিয়ে বিমানের কন্ট্রোল স্টিকটি সামনের দিকে জোরপূর্বক ঠেলে দেন। ফলে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটি অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ১৬,০০০ ফুট নিচে নেমে আসে। এ সময় বিমানের গতি ঘণ্টা প্রতি ৯৭০ কিলোমিটার অতিক্রম করেছিল, যার ফলে বিমানের লেজের অংশ বা ‘রুডার’ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উচ্চতায় থাকা অবস্থায় তীব্র ঝ ঝাঁকুনি ও বৈদ্যুতিক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে বিমানের কেবিনের জরুরি লাইটগুলো নিজে থেকেই জ্বলে ওঠে। বোয়িং ৭৩৭ বিমানে সাধারণত প্রধান বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বা উভয় ইঞ্জিন অকেজো হলে এই আলো নিজে থেকেই সক্রিয় হয়।
যাত্রী ও অফ-ডিউটি পাইলটদের সাহসিকতা
পরিস্থিতি যখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তখন ইয়ানিভ হায়ুন নামের একজন যাত্রী (পেশায় প্লাম্বার) সাহসিকতার সাথে ককপিটে ঢুকে কন্ট্রোল স্টিকটি পেছনের দিকে টেনে ধরেন এবং বিমানের খাড়া পতন রোধ করতে সাহায্য করেন। কিন্তু ইঞ্জিন থ্রাস্ট কম থাকায় বিমানটি আবারও উচ্চতা হারাতে শুরু করেছিল।
পরবর্তী মুহূর্তে বিমানে থাকা দুজন অফ-ডিউটি পাইলট ককপিটের নিয়ন্ত্রণে হাত দেন। ফ্লাইট ডেটা বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, এ সময় তারা বন্ধ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিন দুটি পুনরায় চালু করতে সক্ষম হন এবং বিমানটির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনেন।
জরুরি অবতরণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
সৌদি আরবের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা পরিস্থিতির তীব্রতা অনুধাবন করে বিমানটিকে দ্রুত সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের নির্দেশনা দেন। সেখানে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে। রক্তাক্ত ক্যাপ্টেন মাচ্ছারকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং হামলাকারী সহ-পাইলট আল-হামামিকেও সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ করা হয়।
আবুধাবির হাসপাতাল থেকে এক বার্তায় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার বলেন, "আমি আমার জীবনের জন্য লড়ছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম, বিমানে থাকা কোনো মানুষকেই আমি এভাবে মরতে দিতে পারি না।"
সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই) কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তে নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং ককপিটে ক্র্যাশ অ্যাক্স দিয়ে হামলা চালিয়ে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টাকে এক ধরনের 'সন্ত্রাসী হামলা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন কর্মকর্তা ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এটি কোনো সুসংগঠিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ ছিল না; বরং এটি একজন ব্যক্তির একক উগ্রবাদী পদক্ষেপ। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তদন্তে এখনো পর্যন্ত কোনো তৃতীয় দেশের বা ইরানি হস্তক্ষেপর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।