Hindu festival Gajon: চৈত্রের শেষে শিবের গাজন। জেনে নিন বাংলার প্রাচীন লোকসংস্কৃতির ধর্মীয় গুরুত্ব কি? কেন পালন করা হয়? রইল বিস্তারিত
চৈত্রের শেষে বাংলাজুড়ে গাজনের ঢেউ: লোকসংস্কৃতি, শিবভক্তি ও আচার-বিধির বিস্ময়কর মেলবন্ধন। বাংলার উৎসব-পর্বের গাজন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লোকউৎসব। চৈত্র মাসের শেষে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে শহরতলিতে পর্যন্ত শুরু হয় গাজনের ঢোল, সন্ন্যাসীর গান আর শিব-আরাধনার উৎসব। গাজন কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালির লোকবিশ্বাস।
এই উৎসবকে ঘিরে তৈরি হয় এক বিশেষ আবেগ, যেখানে ভক্তি, তপস্যা, কল্পসন্ন্যাস ও মাটি-জল-আগুন-আকাশের সঙ্গে মানুষের সংযোগ স্থাপনের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। বিভিন্ন অঞ্চলে গাজন ভিন্ন ভিন্ন রীতিতে পালিত হয় — কোথাও মাটি খুঁড়ে শিব বের করা হয়, কোথাও কাঁটার ওপর হেঁটে যাওয়া, আবার কোথাও সন্ন্যাসীরা বাণ ফেলে অগ্নি ত্যাগ করেন। চলুন দেখা যাক, গাজন কী এবং বাংলার কোন অঞ্চলে কী ধরনের গাজন পালন করা হয়।
গাজন কী? 'গাজন' শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানা মত রয়েছে। কেউ বলেন এটি এসেছে ‘গা-জ্বলা’ শব্দ থেকে — যার মানে শরীরের তপস্যা বা জ্বালা দিয়ে শিবের উপাসনা। আবার কেউ বলেন ‘গাজন’ এসেছে ‘গ্রাস’ শব্দ থেকে, যার মানে আত্মার আহার বা আত্মোৎসর্গ। মূলত এই উৎসব শিবঠাকুর, ধর্মঠাকুর, নীল বা ভৈরব দেবতার উদ্দেশ্যে পালিত হয়।
গাজনের মূল আকর্ষণ হলো শিবভক্তদের সন্ন্যাস গ্রহণ, উপবাস, কঠোর ব্রত পালন, শারীরিক কষ্ট সহ্য করে ভক্তি প্রদর্শন। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এই তপস্যার মাধ্যমে তারা শিবের আশীর্বাদ লাভ করেন এবং জীবনের দুঃখ-কষ্ট দূর হয়।
গাজন উৎসবের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো এর লোকসাংস্কৃতিক উপাদান। বহু জায়গায় গাজনের সময় সন্ন্যাসীরা নাচ করেন ‘সন্ন্যাস নৃত্য’, যেখানে শরীরে ছাই মেখে, গেরুয়া পোশাক পরে, হাতে ত্রিশূল বা কাঠি নিয়ে নৃত্যের মাধ্যমে শিবের শক্তি ও ত্যাগের প্রকাশ ঘটানো হয়। লোকগানে উঠে আসে শিব-পার্বতীর প্রেমকথা, তপস্যা, ক্রোধ ও করুণার গল্প। আবার কিছু অঞ্চলে 'গাজনের যাত্রা', ‘ঢপ’, ‘বহর’ কিংবা ‘ধর্মের গান’ অনুষ্ঠিত হয়। এই গানগুলোতে সমাজের কুসংস্কার, অসাম্য, ধর্মীয় আচার, পরিবেশ বা কৃষির উপর নানা বক্তব্য থাকে।
গাজনের ইতিহাসঃ গাজন উৎসবের শিকড় বহু প্রাচীন। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি আর্য-অন্যান্য জনজাতির সংস্কৃতির মিলনের ফল। শিব ছিলেন আদিবাসী ও লোকজ সমাজের অন্যতম প্রধান দেবতা। ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও লোকাচারের সংমিশ্রণে শিব-উপাসনার নানা রূপের মধ্যে গাজনের উদ্ভব ঘটে। একসময় রাজারা, জমিদাররা এই উৎসবকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। মন্দির, রাস্তার পাশে ধর্মঠাকুরের মূর্তি বা সন্ন্যাসীদের আশ্রম এখনও তার নিদর্শন বহন করছে। গাজনের রীতিনীতিতে এমন কিছু বিশ্বাস নিহিত আছে, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য, কৃষিকাজ এবং ঋতুচক্রের সঙ্গে জড়িত। চৈত্র সংক্রান্তিতে গাজনের মাধ্যমে পুরোনো বছরের দুঃখ-কষ্টকে পেছনে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয় একরকম শুদ্ধতা ও সংকল্প নিয়ে।
গাজনের সময়কাল ও প্রেক্ষাপটঃ চৈত্র মাসের ২০ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে গাজনের মূল আচার শুরু হয়। শেষ দিনটি 'চৈত্র সংক্রান্তি' নামে পরিচিত — এই দিন গাজনের মূল পূজা, শোভাযাত্রা এবং তপস্যা শেষ হয়। পরদিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে ‘নববর্ষ’ পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন বছর। এই সময় বাংলার গ্রামে-গঞ্জে হাটে-মাঠে বসে গাজনের মেলা। হাতে তৈরি খেলনা, মাটির পাত্র, গ্রামীণ খাবার, লোকগান—সব মিলিয়ে এক জমজমাট পরিবেশ। বিভিন্ন জায়গায় নাটক, ঢপ, বহর, ধর্মগান, কবিগান ও ঢাকের তালে গাজনের লোকজ পরিবেশনা দেখা যায়।
আজকের দিনে প্রযুক্তি আর নগরায়ণের ভিড়ে অনেক প্রাচীন লোক উৎসব হারিয়ে যাচ্ছে, তবে গাজন এখনও টিকে আছে তার প্রাণশক্তি নিয়ে। এইভাবে গাজন একদিকে যেমন শিবভক্তির উৎসব, তেমনি এটি বাংলার মাটির গন্ধমাখা এক সাংস্কৃতিক পরিচয়। যতদিন গ্রামে ঢোল বাজবে, মাঠে গাজনের গান উঠবে, ততদিন বাংলার প্রাণবন্ত এই উৎসব বেঁচে থাকবে।
গ্রামের সবাই এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে — ধনী-গরিব ভেদ নেই। মেলা বসে, লোকগান হয়, নাটক হয়, শিশু-কিশোরদের জন্য আনন্দের উপকরণ থাকে। এই উৎসব একদিকে যেমন ভক্তির উৎস, তেমনি সমাজে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বার্তাও বহন করে। এটি কেবল তপস্যা, দেহজ কষ্ট বা শিব-ভক্তির সীমাবদ্ধতা নয়, বরং একটি সম্প্রদায়ভিত্তিক সংস্কৃতি, এক আত্মিক যোগাযোগ, এবং লোকজ ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। গাজনের মাধ্যমে বারবার প্রমাণিত হয়—বাংলার উৎসব কেবল দেবতার উদ্দেশ্যে নয়, মানুষ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মধ্যকার নিবিড় বন্ধনের প্রতিফলন।
(Social media brings you the latest breaking news, viral news from the world of social media including Twitter, Instagram and YouTube. The above post is embedded directly from the user's social media account. This body of content has not been edited or may not be edited by Latestly staff. Opinions appearing on social media posts and the facts do not reflect the opinions of Latestly, and Latestly assumes no responsibility for the same.)