প্রতীকী ছবি (Photo Credit: PTI)

7th Pay Commission রাজ্য সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বেতন ও ভাতা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া এখন নতুন মোড়ে। অষ্টম কেন্দ্রীয় বেতন কমিশন গঠনের আবহেই রাজ্য বেতন কমিশন গঠনের বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক অলিন্দে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। এই আবহেই সামনে এসেছে কমিশন গঠনের কার্যপরিধি বা ‘টার্মস অফ রেফারেন্স’ (ToR) সংক্রান্ত একটি তাৎপর্যপূর্ণ দাবিপত্র। যেখানে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ থেকে শুরু করে অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাখা হয়েছে চমকপ্রদ সব প্রস্তাব। কর্মচারী সংগঠনের পক্ষ থেকে তুলে ধরা এই দাবিগুলি চূড়ান্ত কার্যপরিধিতে কতটা স্থান পায়, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীর ভবিষ্যৎ বেতন কাঠামো।

ন্যূনতম মজুরি ও পে-ম্যাট্রিক্সে তিনটি বড় বদলের দাবি

বেতন কাঠামোর মূল ভিত নির্ভর করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ওপর। জমা পড়া প্রস্তাবনায় এই জায়গায় তিনটি বড়সড় পরিবর্তনের আর্জি জানানো হয়েছে:

পরিবারের ইউনিট বৃদ্ধি: এতদিন পর্যন্ত বেতন কমিশনগুলিতে পরিবার-পিছু ৩.৫ ইউনিট ধরে হিসেব কষা হতো। প্রস্তাবনায় তা বাড়িয়ে ৫ ইউনিট করার দাবি তোলা হয়েছে।

ক্যালরি মানদণ্ড পরিবর্তন: ১৯৫৭ সালের ওয়ালেস আয়করয়েড মডেল অনুযায়ী এতদিন দৈনিক ২৭০০ ক্যালরির ভিত্তিতে ন্যূনতম বেতন হিসাব করা হতো। তার পরিবর্তে ICMR অনুমোদিত ৩৪৯০ ক্যালরির আধুনিক মানদণ্ড গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

ইনক্রিমেন্ট বৃদ্ধি: প্রতি বছর ৩ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের পুরনো নিয়ম বদলে অন্তত ৫ শতাংশ করার দাবি উঠেছে, যাতে লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পে-ম্যাট্রিক্স পুনর্গঠন সম্ভব হয়।

কেন্দ্রের সমতুল্য পে-লেভেল এবং ডিএ জট নিরসন

কেন্দ্রীয় বেতন কমিশনের পে-লেভেলের সঙ্গে রাজ্য সরকারের পে-লেভেলের সমতা আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে আইনি জটিলতা এবং অকার্যকর পে-লেভেল সংক্রান্ত সমস্যা এড়িয়ে সর্বভারতীয় স্তরে সামঞ্জস্য বজায় রাখা যায়।

মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ (DA) নিয়ে আর্জিতে বলা হয়েছে, AICPI/CPI-IW সূচক অনুযায়ী তা নির্ধারণ করা হোক। এছাড়া চেন্নাই ইউথ হোস্টেল ও বঙ্গ ভবনের কর্মচারীদের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিএ বিতরণের বৈষম্য দূর করতে একটি স্থায়ী নির্দেশিকা (Standing Order) জারির আবেদন জানানো হয়েছে।

কার্যকরের তারিখ ও ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর

প্রস্তাবনায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে, এই বেতন কমিশন যেন নোশনালি নয়, প্রকৃতপক্ষে ০১.০১.২০২৬ তারিখ থেকে কার্যকর করা হয়। পাশাপাশি, ১০০ শতাংশ ডিএ-কে মূল বেতনের (Basic Pay) সঙ্গে যুক্ত করে অভিন্ন ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর চালুর দাবিও রয়েছে।

ভাতা ও সুযোগ-সুবিধায় যে সব পরিবর্তনের দাবি

বাড়ি ভাড়া ও যাতায়াত ভাতা: কেন্দ্রীয় নিয়মে X, Y, এবং Z শ্রেণির শহরের ভিত্তিতে হাউস রেন্ট অ্যালাউন্স (HRA) ও ট্রান্সপোর্ট অ্যালাউন্স পুনর্বিবেচনা।

দম্পতিদের জন্য ছাড়: স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই সরকারি বা বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত হলে HRA-র সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেওয়ার আর্জি।

শিক্ষাভাবনা: চিলড্রেন এডুকেশন অ্যালাউন্স (CEA) এবং হোস্টেল ভর্তুকি কেন্দ্রীয় হারের সমান করা।

এক নজরে বর্তমান বনাম প্রস্তাবিত কাঠামো:

বিষয়: পরিবারের ইউনিট

বর্তমান ব্যবস্থা: ৩.৫

দাবিপত্রে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা: ৫

বিষয়: ক্যালরি মানদণ্ড

বর্তমান ব্যবস্থা: ২৭০০ (১৯৫৭ মডেল)

দাবিপত্রে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা: ৩৪৯০ (ICMR)

বিষয়: বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট

বর্তমান ব্যবস্থা: ৩%

দাবিপত্রে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা: অন্তত ৫%

বিষয়: কেরিয়ার অ্যাডভান্সমেন্ট (CAS)

বর্তমান ব্যবস্থা: ৩ স্তর (৮-১৫-২৪ বছর)

দাবিপত্রে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা: ৫ স্তর (৫-৮-১২-১৮-২৪ বছর)

বিষয়: কমিউটেড পেনশন পুনর্বহাল

বর্তমান ব্যবস্থা: ১৫ বছর পর

দাবিপত্রে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা: ১১ বছর পর

পদোন্নতি ও অবসরকালীন সুবিধা

কর্মদক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে পুরনো পদোন্নতি নীতি ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে থাকা ৩ স্তরের মডিফায়ড কেরিয়ার অ্যাডভান্সমেন্ট স্কিমের (৮-১৫-২৪ বছর) জায়গায় ৫ স্তরের (৫-৮-১২-১৮-২৪ বছর) নতুন কাঠামোর দাবি উঠেছে।

অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে ১৫ বছরের বদলে ১১ বছর পর কমিউটেড পেনশন পুনর্বহাল এবং অবসরকালে আর্নড লিভের ঘাটতি হাফ পে লিভ (HPL) থেকে পূরণ করে সর্বোচ্চ ৩০০ দিনের লিভ এনক্যাশমেন্টের সুবিধার দাবি জানানো হয়েছে। ৩০ জুন যারা অবসর গ্রহণ করেন, তাঁদের জন্য কেন্দ্রীয় ধাঁচে একটি নোশনাল ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার আর্জিও রয়েছে।

স্বাস্থ্য প্রকল্প ও সচিবালয়ের মর্যাদা

ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ স্কিমের (WBHS) ক্যাশলেস সুবিধার পরিসর বাড়ানো এবং গ্রান্ট-ইন-এইড পেনশনভোগীদের এই প্রকল্পের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া ওয়েস্ট বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট সার্ভিস (WBSS) ও কমন ক্যাডারের (CCW) কর্মীদের ক্যাডার পুনর্গঠনের মাধ্যমে সচিবালয় মর্যাদা বজায় রাখা এবং একটি পারফর্ম্যান্স-লিঙ্কড বোনাস স্কিম চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ইতোমধ্যে কমিশন কাজ শুরু করেছে। কমিশনের কাছে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আসা পরামর্শ ও প্রস্তাবনাগুলি বিবেচনা করে চূড়ান্ত রিপোর্ট পেশ করা হবে। আপাতত রাজ্য অর্থ দফতরের নির্দেশিকা এবং সরকারি ঘোষণার দিকেই নজর রাখছেন সাড়ে আট লক্ষেরও বেশি কর্মী ও পেনশনভোগী।