প্রতীকী ছবি (ফাইল ফটো)

Gold and Silver Prices Today: বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতির জেরে ভারতীয় বাজারে হু-হু করে বাড়ছে মূল্যবান ধাতু সোনার ও রূপোর দাম। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সুরক্ষিত সম্পদের দিকেই ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা। বুধবার দেশের কমোডিটি বাজার (MCX)-এ সোনা ও রূপোর ফিউচার্স বা ভাইদা কারবারে বড়সড় উত্থান দেখা গেল।

সকালে কতটা বাড়ল দর?

বুধবার সকালে মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জে (MCX) আগস্ট ফিউচার্সে সোনা ১ শতাংশেরও বেশি লাফিয়ে প্রতি ১০ গ্রামে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৫০০ টাকার গণ্ডি পার করে ফেলে। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বরের রূপোর চুক্তি ১ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি কেজিতে ২,২৬,৩৫০ টাকার স্তর ছাড়িয়ে যায়। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়েই দেশের শেয়ার বাজার ও ভাইদা বাজারে এমন দরবৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারে ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম প্রায় ৪ হাজার ০৯৭.১৬ ডলারে পৌঁছে যায়, যা আগের দিনের তুলনায় ০.৪৮ শতাংশ এবং বিগত এক বছরের নিরিখে ২০.৯৪ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে রূপোর বাজারেও চরম অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রেকর্ড ১২১.৬২ ডলার স্পর্শ করার পর রূপোর দর কিছুটা ওঠানামা করছে।

বিশ্ববাজারের উত্তাপ ও ভূ-রাজনীতি

আন্তর্জাতিক বাজারের একাধিক প্রতিকূল প্রভাব সোনা ও রূপোর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করছে:

ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: মধ্যপ্রাচ্যের টানা সংঘাত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা বিনিয়োগকারীদের সোনা বা রূপোর মতো 'সেফ হ্যাভেন' বা সুরক্ষিত সম্পদে টাকা রাখতে বাধ্য করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির সোনা ক্রয়: পিপলস ব্যাংক অব চায়না, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI) এবং একাধিক গালফ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেদের মুদ্রা সুরক্ষায় এবং রিজার্ভ মজবুত করতে বিপুল পরিমাণ সোনা কেনাকাটা অব্যাহত রেখেছে।

মুদ্রাস্ফীতি ও মার্কিন ঋণ: বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ এবং আমেরিকার আকাশছোঁয়া সরকারি ঋণের বোঝা সোনা-রূপোর চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ভারতের ঘরোয়া বাজারের চিত্র

বিশ্ববাজারের সংকেতের পাশাপাশি ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কারণও সোনা-রূপোর দাম বাড়িয়ে চলেছে:

উর্ধ্বমুখী মুদ্রাস্ফীতি: ২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের মুদ্রাস্ফীতির হার যেখানে ছিল ৩.৯৩ শতাংশ, জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৩৮ শতাংশে। এটি রিজার্ভ ব্যাংকের নির্ধারিত ৪.০ শতাংশ সীমার উপরে রয়েছে। ফলে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে বাঁচতে সোনার প্রতি আকর্ষণ আরও বেড়েছে।

রূপোর সরবরাহে টান: রূপোর বাজারে আমদানি নিয়ন্ত্রণের নতুন বিধিনিষেধ চলায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে দর স্বাভাবিক হারের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ উঁচুতে অবস্থান করছে। ২০২৬ সালের জুনে ভারতে মাত্র ১০ লক্ষ আউন্স রূপো আমদানি হয়েছে, যা ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় ৮৪ শতাংশ কম।

বাজার বিশেষজ্ঞ ও ব্রোকারেজ সংস্থার পূর্বাভাস

ভবিষ্যতে সোনা-রূপোর গতিপথ কেমন থাকবে, তা নিয়ে আর্থিক বিশেষজ্ঞ ও বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থাগুলির মধ্যে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের নজরই ইতিবাচক:

জেপি মরগান (J.P. Morgan): ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিক নাগাদ প্রতি আউন্স সোনার গড় দাম ৬,০০০ ডলার এবং রূপোর গড় দাম ৮১ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছে তারা।

রয়টার্স পোল: চলতি বছর রূপোর গড় দর প্রতি আউন্স ৭৯.৫০ ডলার থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

গোল্ডম্যান স্যাক্স (Goldman Sachs): শক্তিশালী মার্কিন ডলারের দিকে ইঙ্গিত করে ২০২৬ সাল শেষে সোনার দর প্রতি আউন্স ৪,৯০০ ডলার হতে পারে বলে অনুমান সংশোধন করেছে।

ইউবিএস (UBS) ও ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল: বর্তমানে সোনা ৩,৮৫০ থেকে ৪,০০০ ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করলেও আগামী ১২ মাসে তা ৫,২০০ ডলার স্পর্শ করতে পারে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের মতে, বৈশ্বিক ঝুঁকি আরও বাড়লে সোনার দামে বড় ধরনের উত্থান দেখা যেতে পারে।

নজর থাকবে কোথায়?

আগামী দিনে সোনা ও রূপোর দর কেমন থাকবে, তা মূলত নির্ভর করবে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত এবং সুদের হারের নীতির ওপর। চলতি বছরে ফেড তাদের সুদের হার ৩.৫০% থেকে ৩.৭৫%-এর মধ্যে বজায় রেখেছে। পাশাপাশি, সৌরশক্তি ও ইলেকট্রিক যানবাহনে (EV) রূপোর বাণিজ্যিক চাহিদা কেমন থাকে এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী রূপ নেয়— সেই দিকেই এখন প্রখর নজর রাখছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।